পূর্ণ ক্ষমতায় চালু ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২৩-০৮-২০২৬ ১১:৫৮:৩৯ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
২৩-০৮-২০২৬ ১২:০৮:৪৬ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে শনিবার (২২আগস্ট) সকালে নতুন এলএনজিভর্তি কার্গো ভিড়েছে। তিনদিন বন্ধ থাকার পর এদিন আবারও উৎপাদনে ফিরেছে এ মার্কিন এফএসআরইউ। অপর প্রতিষ্ঠান সামিট এলএনজি টার্মিনাল আগে থেকেই সক্ষমতার চেয়ে বেশি হারে গ্যাস সরবরাহ করছিল। দুটি ভাসমান টার্মিনাল চালু হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। ফলে দেশব্যাপী বেড়েছে বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহ। স্বাভাবিক কারণেই কমেছে লোডশেডিং। চাপ বেড়েছে বাসাবাড়ি এবং কারখানার গ্যাসলাইনেও।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চাহিদা কিছুটা কম থাকায় সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে ব্যবহারকারীদের মধ্যে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন সংশ্লিষ্টরা। সন্ধ্যায় রাজধানীর কয়েকটি সিএনজি পাম্পে খবর নিয়ে জানা যায়, গ্যাসের চাপ গত কয়েকদিনের তুলনায় বেড়েছে। এতে করে অধিকাংশ পাম্পই নিজেদের সব পয়েন্ট চালু রেখেছে। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তি অনেক কমে এসেছে।
ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে সিএনজি স্টেশনে গ্রাহকের লাইন। অনেক ব্যক্তিগত গাড়িও গতকাল সিএনজি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান তারা। পাম্পমালিকরা জানান, গ্যাসের প্রেশার ভালো থাকায় একেকটি অটোরিকশায় গতকাল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত গ্যাস দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যেখানে গত দিনগুলোতে প্রেশার কম থাকায় ১০০ টাকার গ্যাস পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। হাজীপাড়া পেট্রোল পাম্পের বিক্রয়কর্মী জাহিদুল জানান, অনেক দিন পর তিনি সিএনজিচালকদের মুখে হাসি দেখতে পেয়েছেন।
এদিকে পুরোনো ঢাকার হক ব্রেডের মালিক রেজাউল হক রেজু বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে আমাদের সেক্টরের হাজার হাজার উদ্যোক্তার পথে বসার উপক্রম হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া না হলেও আমাদের এ সাময়িক সন্তুষ্টি কোনো কাজে আসবে না। রাজধানীর মিরপুরের গৃহিণী মরিয়ম জামিলা জানান, তার বাসার চুলায় অনেক দিন পর গ্যাসের প্রেশার ফিরে এসেছে। চুলা জ্বলছে স্বাভাবিক গতিতে। ফলে অনেকদিন পর একটি ভালো দিন কাটল বলে জানান তিনি।
জানা যায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি জায়ান্ট বিপি সিঙ্গাপুরের সরবরাহ করা এলএনজিভর্তি একটি কার্গো জাহাজ গতকাল সকালে মহেশখালী টার্মিনালে এসে নোঙর করে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতঃপূর্বে জরুরিভিত্তিতে তাদের কাছ থেকে এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয়। মূলত রোববার জাহাজটির আসার কথা থাকলেও একদিন আগেই চলে আসে। ফলে গতকাল দুপুর থেকেই এক্সিলারেট এনার্জির গ্যাস সরবরাহ চালু করা সম্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে দৈনিক প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট দিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়তে থাকে। রাতের মধ্যে সক্ষমতার সবটুকু, তথা সরবরাহ ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গতকাল ৫৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। নিরাপত্তা ইস্যুতে সৌদি আরামকোর একটি এলএনজিভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ আগস্ট এলএনজি সংকটে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই এ টার্মিনালটি দীর্ঘসময় অকেজো ছিল।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ নেমে যায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে বাংলাদেশের সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এ দুটি টার্মিনালের মোট সর্বোচ্চ রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ অবস্থায় আরো তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশব্যাপী জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে সরকার নতুন আরো তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে । পায়রা, মোংলা এবং হিরণ পয়েন্টে নতুন এ ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে।
পিডিবি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আংশিক বন্ধ থাকায় অন্যান্য কর্মদিবসের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল কিছুটা কম। দিনের পিক আওয়ারে সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৫০০ থেকে ১৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ায় গতকাল ১৩ হাজার ৮০০ থেকে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান অনেক কমে ৫০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়।
ঢাকা এবং প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোতে বড় কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে ঢাকার বাইরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) নিয়ন্ত্রিত কিছু গ্রামীণ এলাকায় পিক আওয়ারে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে দেশজুড়ে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় ক্ষেত্র এবং আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে গতকাল মোট সরবরাহ করা হয় ২২২ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণ ১৫০ থেকে ১৭০ কোটি ঘনফুট। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গতকাল সরবরাহ করা হয় ১৬০ থেকে ১৬২ কোটি ঘনফুট।
সারা দেশে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৬২ শতাংশ সরাসরি বিদ্যুৎ খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। জাতীয় গ্রিডভুক্ত প্রধান গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০০ কোটি ঘনফুট। বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ১,১৫৮.৫ কোটি ঘনফুট।
এদিকে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) সচল হওয়ায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শিল্পে গ্যাসের চাপ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে।
আজ রোববার থেকে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় সরকার এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে গ্যাস বাঁচানোর পরিকল্পনা করছে। এ উদ্বৃত্ত গ্যাস সরাসরি শিল্পকারখানায় ডাইভার্ট করা হবে, ফলে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নাগাদ কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে বলে আশা করছেন তারা। সূত্র: আমার দেশ
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স